মেনু নির্বাচন করুন
পাতা

বিভাগের ঐতিহ্য

 

চট্টগ্রাম বিভাগের ঐতিহ্য

চট্টগ্রাম বাংলাদেশের ৭টি বিভাগের মধ্যে সৌন্দর্য, বৈচিত্র্য ও বিশালতায় সমৃদ্ধ। ভূ-প্রাকৃতিক রূপে যেমন এর বিচিত্রতা তেমনি ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিতে রয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগের ঐশ্বর্যমণ্ডিত বৈশিষ্ট্য। এ বিভাগের চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা, লক্ষ্মীপুর, চাঁদপুর সহ প্রায় সকল জেলায় রয়েছে নিজ নিজ ঐতিহ্যগত বৈশিষ্ট্য। নীচে জেলাভিত্তিক এ বিভাগের ঐতিহ্যসমূহ উল্লেখ করা হলঃ

 

চট্টগ্রাম জেলাঃ

চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সুপ্রাচীন। জানা ইতিহাসের শুরু থেকে চট্টগ্রামে আরাকানী মঘীদের প্রভাব লক্ষনীয়। ফলে গ্রামীণ সংস্কৃতিতেও এর যথেষ্ট প্রভাব রয়েছে। সে সময় এখানকার রাজারা বৌদ্ধধর্মাবলম্বী হওয়ায় তার প্রভাবও যথেষ্ট। সুলতানি, আফগান এবং মোগল আমলেও আরাকানীদের সঙ্গে যুদ্ধবিগ্রহ লেগেই ছিল। ফলে শেষ পর্যন্ত মঘীদের প্রভাব বিলুপ্ত হয়নি। এছাড়া চট্টগ্রামের মানুষ আতিথেয়তার জন্য দেশ বিখ্যাত।

চট্টগ্রামের বর্তমান সংস্কৃতির উন্মেষ হয় ১৭৯৩ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কর্তৃক চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রবর্তনের পর। এর ফলে ভারতীয় উপমহাদেশে সামাজিক ধানোৎপাদন ও বন্টনে পদ্ধতিগত আমূল পরিবর্তন হয়। অন্যান্য স্থানের মতো চট্টগ্রামেও একটি নতুন মধ্যবিত্ত সম্প্রদায়ের উদ্ভব হয়। নতুন এরই ফাঁকে ইংরেজরা প্রচলনা করে ইংরেজি শিক্ষা। মধ্যবিত্ত সম্প্রদায় ইংরেজি শিক্ষার মাধ্যমে পাশ্চাত্যের সঙ্গে পরিচিত হতে শুরু করে।

 

চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানের ইতিহাস সমৃদ্ধ। শেফালী ঘোষ এবং শ্যাম সুন্দর বৈষ্ণবকে বলা হয় চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানের সম্রাট ও সম্রাজ্ঞি। মাইজভান্ডারী গান ও কবিয়াল গান চট্টগ্রামের অন্যতম ঐতিহ্য। কবিয়াল রমেশ শীল একজন বিখ্যাত কিংবদন্তি শিল্পী। জনপ্রিয় ব্যান্ড সোলস, এল আর বি, রেঁনেসা, নগরবাউল এর জন্ম চট্টগ্রাম থেকেই। আইয়ুব বাচ্চু, কুমার বিশ্বজিৎ, রবি চৌধুরী, নাকিব খান, পার্থ বডুয়া, সন্দিপন, নাসিম আলি খান, মিলা ইসলাম চট্টগ্রামের সন্তান। নৃত্যে চট্টগ্রামের ইতিহাস মনে রখার মত। রুনু বিশ্বাস জাতীয় পর্যায়ে বিখ্যাত নৃত্যগুরু। চট্টগ্রামের বিখ্যাত সাংস্কৃতিক সংগঠন হল দৃষ্টি চট্টগ্রাম www.drishtyctg.com, বোধন আবৃত্তি পরিষদ, প্রমা, আলাউদ্দিন ললিতকলা একাডেমি, প্রাপন একাডেমি, উদিচি, আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদ, ফু্লকি, রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী সংস্থা, রক্তকরবী, আর্য সঙ্গীত, সঙ্গীত পরিষদ। মডেল তারকা নোবেল, মৌটুসি, শ্রাবস্তীর চট্টগ্রামে জন্ম । সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড পরিচালিত হয় জেলা শিল্পকলা একাডেমি, মুসলিম হল, থিয়েটার ইন্সটিটিউট।

 

চট্টগ্রাম নামের উৎস

বৈচিত্রময়ী চট্টগ্রামের নামও বৈচিত্রে ভরা। খ্রিষ্টীয় দশক শতকের আগে চট্টগ্রাম নামের অস্তিত্ব ছিল না। অর্থাৎ চট্টগ্রাম নামের কোন উৎসের সন্ধান পাওয়া যায় না। তাই দেখা যায় যে, সুপ্রাচীনকাল থেকে এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন পরিব্রাজক, ভৌগোলিক এবং পন্ডিতগণের লিখিত বিবরণে, অঙ্কিত মানচিত্রে, এখানকার শাসক গৌড়ের সুলতান ও রাজাদের মুদ্রায় চট্টগ্রামকে বহু নামে খ্যাত করেছিলেন। এ পর্যন্ত চট্টগ্রামের ৪৮টি নাম পাওয়া গেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ‌‌-সুহ্মদেশ, ক্লীং, রম্যভূমি,চাতগাঁও, চট্টল, চৈত্যগ্রাম, সপ্তগ্রাম, চট্টলা, চক্রশালা, শ্রীচট্টল,চাটিগাঁ, পুস্পপুর, চিতাগঞ্জ, চাটিগ্রাম ইত্যাদি। কিন্তু কোন নামের সঙ্গে পাঁচজন একমত হন না। সে সব নাম থেকে চট্টগ্রামের নাম উৎপত্তির সম্ভাব্য ও চট্টগ্রামের নামের সঙ্গে ধ্বনিমিলযুক্ত তেরটি নামের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি তুলে ধরা হলো।

 

  • চৈত্যগ্রাম:চট্টগ্রামের বাঙালি বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের অভিমত এই যে, প্রাচীনকালে এখানে অসংখ্য বৌদ্ধ চৈত্য অবস্থিত ছিল বলে এ স্থানের নাম হয় চৈত্যগ্রাম। চৈত্য অর্থ বৌদ্ধমন্দির কেয়াং বা বিহার। এই চৈত্যের সঙ্গে গ্রাম শব্দ যুক্ত হয় বলে চৈত্যগ্রাম নামের উদ্ভব হয়। পরবর্তীকালে চৈত্যগ্রাম নাম বিবর্তিত হয়ে চট্টগ্রাম রূপ প্রাপ্ত হয়।
  • চতুঃগ্রাম:ব্রিটিশ আমলের গেজেটিয়ার লেখক ও'মলি সাহেবের মতে,সংস্কৃত চতুঃগ্রাম শব্দ থেকে চট্টগ্রাম নামের উৎপত্তি। চতুঃ অর্থ চার। চতুঃ শব্দের সঙ্গে গ্রাম শব্দ যুক্ত হয়ে চতুঃগ্রাম হয়। চতুঃগ্রাম বিবর্তিত হয়ে চট্টগ্রাম রূপ প্রাপ্ত হয়।
  • চট্টল:চট্টগ্রামের তান্ত্রিক ও পৌরাণিক নাম ছিল চট্টল। হিন্দু সম্প্রদায়ের বিভিন্ন তন্ত্র ও পুরাণগ্রন্থে চট্টল নামের উল্লেখ দেখা যায়।

 

ইবনে বতুতার বিবরণীতে চট্টগ্রাম

সেসময়ে ১৩৪৬ খ্রিস্টাব্দে চট্টগ্রাম আসেন বিখ্যাত মুর পরিব্রাজক ইবনে বতুতা। তিনি লিখেছেন -“বাংলাদেশের যে শহরে আমরা প্রবেশ করলাম তা হল সোদকাওয়াঙ (চট্টগ্রাম)। এটি মহাসমূদ্রের তীরে অবস্থিত একটি বিরাট শহর, এরই কাছে গঙ্গা নদী- যেখানে হিন্দুরা তীর্থ করেন এবং যমুনা নদী একসঙ্গে মিলেছে এবং সেখান থেকে প্রবাহিত হয়ে তারা সমুদ্রে পড়েছে। গঙ্গা নদীর তীরে অসংখ্য জাহাজ ছিল, সেইগুলি দিয়ে তারা লখনৌতির লোকেদের সঙ্গে যুদ্ধ করে। ...আমি সোদওয়াঙ ত্যাগ করে কামরু (কামরূপ) পর্বতমালার দিকে রওনা হলাম।”১৩৫২‌-৫৩ সালে ফকরুদ্দীন মোবারক শাহ এর পুত্র ইখতিয়ার উদ্দিন গাজী শাহকে হত্যা করে বাংলার প্রথম স্বাধীন সুলতান ইলিয়াস শাহ বাংলার মসনদ দখল করলে চট্টগ্রামও তার করতলগত হয়। তার সময়ে চট্টগ্রাম বাংলা প্রধান বন্দর হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। এর পর হিন্দুরাজা গণেশ ও তার বংশধররা চট্টগ্রাম শাসন করে। এরপরে বাংলায় হাবমী বংশ প্রতিষ্ঠা হয়।

চীনা পর্যটকের বিবরণীতে চট্টগ্রাম

পনের শতকের চট্টগ্রামের একটি বিবরণ পাওয়া যায় চীনা পরিব্রাজক ফেই‌-শিন এর ‘’শিং-ছা-শ্যাং-লান’’ নামের ভ্রমণ গ্রণ্থে। জালালুদ্দিন মুহম্মদ শাহ-এর আমলে চীনা দূতদের মধ্যে ফেই-শিন ছিলেন। ১৪৩৬ খ্রীস্টাব্দে তিনি উক্ত বইতে চট্টগ্রাম সম্পর্কিত বর্ণনা দেন :
বাতাস অনুকুল থাকলে সুমাত্রা থেকে এই দেশে কুড়ি দিনে পৌঁছানো যায়। এ দেশ (চীনের) পশ্চিমে অবস্থিত ভারতবর্ষ নামে দেশটির অন্তর্গত। সম্রাট যুং-লোর রাজত্বের ত্রয়োদশ বর্ষে (১৪১৫ খ্রি.) সম্রাট দুইবার আদেশ জারি করার পরে প্রতিনিধি হৌ-শিয়েনএক বিরাট নৌবহর আর এবং অনেক লোকজন নিয়ে (বাংলার) রাজা, রানি এবং অমাত্যদের কাছে তাঁর (চীন সম্রাটের) উপহার পৌঁছে দেওয়ার জন্য রওনা হলেন।এই দেশটির উপসাগরের কূলে একটি সামুদ্রিক বন্দর আছে তার নাম চা-টি-কিয়াং। এখানে কোন কোন শুল্ক আদায় করা হয়। রাজা যখন শুনলেন আমাদের জাহাজ সেখানে পৌছেছে, তিনি পতাকা ও অন্যান্য উপহার সমেত উচ্চ পদস্থ রাজকর্মচারীদের সেখানে পাঠালেন। হাজারেরও বেশি ঘোড়া ও মানুষ বন্দরে এসেহাজির হল। ষোলটি পর্ব অতিক্রম করে আমরা সুও‌-না-উল-কিয়াং (সোনারগাঁও)-তে পৌঁছলাম। এই জায়গাটি দেওয়াল দিয়ে ঘেরা; এখানে পুকুর, রাস্তাঘাট ও বাজার আছে, সেখানে সবরকম জিনিসের বেচাকেনা চলে। এখানে রাজার লোকেরা হাতি, ঘোড়া,প্রভৃতি নিয়ে আমাদের সঙ্গে দেখা করলো। 
কিন্তু ১৪৯২ সালে সুলতান হোসেন শাহ বাংলা সুলতান হোন। কিন্তু চট্টগ্রামের দখল নিয়ে তাকে ১৪১৩-১৪১৭ সাল পর্যন্ত ত্রিপুরার রাজা ধনমানিক্যের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত থাকতে হয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত রাজা ধনমানিক্যের মৃত্যুর পর হোসেন শাহ‌-এর রাজত্ব উত্তর আরাকান পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। তার সময়ে উত্তর চট্টগ্রামের নায়েব পরাগল খানের পুত্র ছুটি খাঁর পৃষ্ঠপোষকতায় শ্রীকর নন্দী মহাভারতের একটি পর্বের বঙ্গানুবাদ করেন।

কুমিল্লা জেলাঃ

কুমিল্লার খাদি 

প্রাচীনকাল থেকে এই উপ-মহাদেশে হস্তচালিত তাঁত শিল্প ছিল জগদ্বিখ্যাত। দেশের চাহিদা মিটিয়ে সব সময় এই তাঁতের কাপড় বিদেশেও রপ্তানি হতো। একটি পেশাজীবী সম্প্রদায় তাঁত শিল্পের সাথে তখন জড়িত ছিলেন। তাদেরকে স্থানীয় ভাষায় বলা হতো ‘যুগী’ বা ‘দেবনাথ’। বৃটিশ ভারতে গান্ধীজীর অসহযোগ আন্দোলনের সময়কালে ঐতিহাসিক কারণে এ অঞ্চলে খাদি শিল্প দ্রুত বিস্তার লাভ ও জনপ্রিয়তা অর্জন করে। তখন খাদি কাপড় তৈরি হতো রাঙ্গামাটির তূলা থেকে। জেলার চান্দিনা, দেবিদ্বার, বুড়িচং ও সদর থানায় সে সময় বাস করতো প্রচুর যুগী বা দেবনাথ পরিবার। বিদেশি বস্ত্র বর্জনে গান্ধীজীর আহ্বানে সে সময় কুমিল্লায় ব্যাপক সাড়া জাগে এবং খাদি বস্ত্র উৎপাদনও বেড়ে যায়। দেশের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে পড়তে থাকে কুমিল্লার খাদি বস্ত্র। এই বস্ত্র জনপ্রিয়তা অর্জন করে কুমিল্লার খাদি হিসাবে।

গান্ধীজী প্রতিষ্ঠিত কুমিল্লার অভয় আশ্রম খাদি শিল্প প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অনুশীলন চক্রের আশ্রয় স্থল হিসেবে ছদ্ম বরণে প্রতিষ্ঠিত সমাজ কল্যাণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে অভয় আশ্রম প্রতিষ্ঠিত হয়। বিদেশি কাপড় বর্জনের ডাকে যখন ব্যাপক হারে চরকায় সূতা কাটা শুরু হয়। অভয় আশ্রম তখন সুলভে আশ্রমে তৈরি চরকা বাজারে বিক্রির পাশাপাশি নিজেরাও তৈরি করতে থাকে খাদি বস্ত্র। বিভিন্ন গ্রামে তৈরি খাদি বস্ত্র ও এ সময় অভয় আশ্রমের মাধ্যমে বাজারজাত করতে শুরু করে।

প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, ১৯২৬-২৭ সালে একটি ৮ হাত লম্বা ধুতি বিক্রি হতো মাত্র পাঁচশিকে দামে। সে সময় কুমিল্লা অভয় আশ্রম প্রায় ৯ লাখ টাকা মূল্যের খাদি কাপড় বিক্রি করেছিল। প্রয়াত রবীন্দ্র সংগীত বিশারদ, অভয় আশ্রমের একজন কর্মী পরিমল দত্তের লেখা থেকে জানা যায়, বিপুল চাহিদা থাকলেও অভয় আশ্রম থেকে সে চাহিদা সম্পূর্ণভাবে পূরণ হতো না।

খাদির দ্রুত চাহিদার কারণে দ্রুত তাঁত চালানোর জন্য পায়ে চালিত প্যাডেলের নীচে মাটিতে গর্ত করা হতো। এই গর্ত বা খাদ থেকে যে কাপড় উৎপন্ন হতো সেই কাপড় খাদি। এভাবে খাদি নামের উৎপত্তি। ক্রমান্বয়ে এই কাপড় খাদি বা খদ্দর নামে প্রসিদ্ধি লাভ করে।

স্বাধীনতা পরবর্তী সময় খাদি শিল্পের ছিল স্বর্ণযুগ। এর পরপরই আসে সংকটকাল। যুদ্ধ বিধ্বস্ত বস্ত্রকলগুলো তখন বন্ধ। বস্ত্র চাহিদা মেটাতে আমদানি নির্ভর দেশে হস্তচালিত তাঁতের কাপড়ের উপর প্রচুর চাপ পড়ে। দেশের বা মানুষের চাহিদার তুলনায় খাদির উৎপাদন ব্যাপক না হলেও চান্দিনা বাজারকে কেন্দ্র করে আশ-পাশের গ্রামগুলোতে তাঁতীরা চাদর, পর্দার কাপড়, পরার কাপড় তৈরি করতে শুরু করে। স্বাধীনতার পূর্বে খাদির চাহিদা শীত বস্ত্র হিসেবে ব্যাপক ছিল। খাদি বস্ত্রের চাহিদের সুযোগে এ অঞ্চলের কতিপয় অতীত সরকারের দেয়া সুতা, রং এর লাইসেন্স গ্রহণের সুবাধে মুনাফা লুটে মধ্যস্বত্ব ভোগী হিসেবে। সুলভ মূল্যে সুতা ও রংয়ের অভাবে প্রকৃত তাঁতীরা সে সময় তাদের মূল পেশা বদল করতে বাধ্য হন । আশির দশকের মাঝামাঝি দেশে ব্যাপক হারে পাওয়ার লুম ভিত্তিক বস্ত্র শিল্প গড়ে উঠে। ফলে অতুলা জাত বস্ত্রের প্রসার ব্যাপক হারে ঘটে। বেড়ে যায় পলিয়েস্টার, রেয়ন, ভিসকম এ্যাক্রেলিক সুতার ব্যবহার। রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাকের জন্য আমদানি হতে থাকে শুল্ক মুক্ত বিদেশি বস্ত্র। এভাবে খাদ থেকে খাদি নামের যে বস্ত্রের প্রসার ঘটেছিল তা হারিয়ে যায় বিলুপ্তির খাদে।

কুমিল্লার খাদি শিল্পের ব্যাপক প্রসার ঘটলেও এই শিল্প মূলত কুটির শিল্প। গ্রাম্য বধূরা গৃহস্থালি কাজের ফাঁকে ফাঁকে চরকায় সুতা কেটে তাঁতীদের কাছে বিক্রি করে বাড়তি আয়ের সুযোগ পেত। যে বৃদ্ধ লোকটি খেতে খামারে পরিশ্রম করতে পারত না, যে কিশোর- কিশোরী বাইরে শ্রম বিক্রির সুযোগ পেত না তারাও চরকায় সুতা কেটে সংসারে বাড়তি আয়ের সুযোগ পেত।

 

কুমিল্লার রসমালাই:

 

উনিশ শতকে ত্রিপুরার ঘোষ সম্প্রদায়ের হাত ধরে রস মালাইএর প্রচলন হয়। সে সময় বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে মিষ্টি সরবরাহের কাজটা মূলত তাদের হাতেই হত। মালাইকারির প্রলেপ দেয়া রসগোল্লা তৈরি হত সে সময়। পরে দুধ জ্বাল দিয়ে তৈরি ক্ষীরের মধ্যে ডোবানো রসগোল্লার প্রচলন হয়। ধীরে ধীরে সেই ক্ষীর রসগোল্লা ছোট হয়ে আজকের রসমালাই এ পরিণত হয়েছে ।

 

কুমিল্লার মৃৎ-শিল্পঃ

 

বাংলার লোকশিল্পের আবহমান সুপ্রাচীন ঐতিহ্যের অন্যতম কুমিল্লার মৃৎশিল্পের বিভিন্ন পণ্য । প্রাচীনকাল থেকেই কুমিল্লায় তৈরি কৃত গৃহস্থালি তৈজসের মধ্যে কলসি, হাঁড়ি, জালা, সরাই বা ঢাকনা, শানকি, থালা, কাপ, বদনা, ধূপদানি, মাটি নির্মিত নানা খেলনা এবং ফল, পশু-পাখি ইত্যাদি বিখ্যাত ছিল । তবে আধুনিকতার ছোঁয়ায় তা ক্রমশ ম্রিয়মাণ হতে থাকলে ১৯৬১ সালে ডঃ আখতার হামিদ খান বিজয়পুর রুদ্রপাল মৃৎশিল্প সমবায় সমিতির প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৭১ সালে পাকবাহিনী এটিতে আগুন ধরিয়ে দেয়।

 

যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৭৫ হাজার টাকা অনুদান দিলে সমিতিটি আবার ঘুরে দাড়ায়। ২০০৯-২০১০ অর্থবছরে সমবায় মন্ত্রণালয়ের আর্থিক সহায়তায় এখানে গড়ে তোলা হয়েছে  - মৃৎ-শিল্প প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। এখানে বছরের বিভিন্ন সময়ে ২০জন করে বেশ কয়েকটি ব্যাচে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। এক পক্ষকালব্যাপী প্রশিক্ষণ শেষে একেকজন কুমার হয়ে উঠেন একেকজন দক্ষ শিল্পী।

বর্তমানে কুমোরেরা বিভিন্ন শোপিস এর পাশাপাশি ফুলের টব, বিভিন্ন ধরনের মুর্তি, সিরামিকস কালার, দীর্ঘস্থায়ী সেনেটারি লেট্রিনের চাক, পানির ট্যাংকি ইত্যাদিতৈরী করছেন।

 

লক্ষ্মীপুর জেলাঃ

লক্ষ্মীপুর জেলায় কয়েকজন পীরবুজুর্গের মাজার রয়েছে, যেগুলো ঐতিহাসিক এবং স্থাপত্যশৈলীর দিক থেকে অনেক উন্নত। পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার জন্য রামগতি একটি উপযুক্ত স্থান। রামগতি বাজারের পশ্চিম দিক দিয়ে মেঘনা নদী বঙ্গোপসাগরে পড়েছে। এখানকার নৈসর্গিক দৃশ্য খুবই মনোরম। এটি একটি প্রাকৃতিক সমুদ্র সৈকত। পর্যটকরা এখানে বসে ইলিশ ধরার রোমাঞ্চকর দৃশ্য উপভোগ করতে পারে। রামগতি ভ্রমণের সময় পর্যটকরা সেখানকার মিষ্টি এবং মহিষের দুধে তৈরি ঐতিহ্যবাহী দই সংগ্রহ ও উপভোগ করতে পারে। এখানে কুয়াকাটার মত সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের দৃশ্য অবলোকন করা যায়। বন বিভাগের বিশাল বনায়ন, কেয়াবনের সবুজ বেস্টনীও নজরে আসবে। যাতে সড়ক ও নৌপথে পর্যটকদের যাতায়াতে সুবিধা হয়। পর্যটন স্পটগুলো সরকারের সংরক্ষণ নীতিমালার আওতায় রাখা এবং এর উন্নয়ন প্রয়োজন।  পর্যটকদের সুবিধার্থে আধুনিক হোটেল, মোটেল ও রেস্টুরেন্ট স্থাপন করা প্রয়োজন।

 

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলাঃ

তিতাসপাড়ের ব্রাহ্মণবাড়িয়া। অদ্বৈত মল্লবর্মণের ‘‘তিতাস একটি নদীর নাম’’ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায় যেমন, তেমনই তিতাস ও ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে দেশ বিদেশে ব্যাপক পরিচিতি এনে দেয়। জেলার নাসিরনগর থানার চাতলপুর নামক স্থানে নিকটস্থ মেঘনানদী থেকে উৎপন্ন হয়ে পূর্বমুখে প্রবাহিত হয়ে চান্দোরা গ্রামের উত্তরে-পশ্চিমে-দক্ষিণ মুখে অগ্রসর হয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের নিকট পূর্ব দক্ষিণ মুখে প্রবাহিত হয়ে আখাউড়া রেলজংশনের দক্ষিণে পশ্চিম-উত্তর মুখে গিয়ে নবীনগরের পশ্চিমে লালপুরের নিকট মেঘনা নদীতে পতিত হয়েছে। নদীটি ইংরেজি বর্ণ এম আকার প্রবাহিত হচ্ছে। চাতলপুর থেকে লালপুরের দূরত্ব ১৬ মাইল হলেও সমগ্র নদীটি প্রায় ১২৫ মাইলদীর্ঘ। আর এই নদীটিই তিতাস নদী নামে পরিচিত। এছাড়া আরো কয়েকটি নদী তিতাসনদী নামে এই এলাকায় পরিচিতি লাভ করেছে। সেগুলি হল :

(১) নবীনগর থানার পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিতকালিগঞ্জ বাজারের উত্তরে মেঘনা নদী থেকে উৎপন্ন হয়ে একটি ছোট নদী দক্ষিণ মুখে গিয়ে পূর্ব দিকে মোড় নিয়ে জীবনগঞ্জ বাজারকে বাম পাশে রেখে দরিকান্দি গ্রামের উত্তর পার্শ্ব দিয়ে প্রবাহিত হয়ে কালাইনগরের নিকট দক্ষিণমুখী গতি ধারণ করে বাঞ্ছারামপুর থানাকে ডান পাশে রেখে ঘাঘুটিয়ার নিকট তিতাসের আর একটি গতিধারা সঙ্গে মিশ পশ্চিম মুখে গিয়ে উজানচরকে ডানপাশে ও হোমনা থানাকে বামপাশে রেখে শ্রীমদ্দির নিকট মেঘনা নদীতে পড়েছে। এটি তিতাস নদী নামেই পরিচিত। হোমনা থানায় এটি আবার চিতিগঙ্গা নামে পরিচিত।

(২) আবার বাঞ্ছারামপুর থানার দরিকান্দিগ্রামের উত্তর পূর্ব দিক থেকে প্রায় অনুরূপ আকারের একটি নদী দক্ষিণ মুখেপ্রবাহিত হয়ে রামকৃষ্ণপুরে নিকট আরো একটি তিতাস নদীর সঙ্গে মিলিত হয়েপশ্চিম দিকে প্রবাহিত হয়ে ঘাঘুটিয়ার নিকট পূর্বোক্ত তিতাসের সঙ্গে মিলিত হয়েছে। এটিও তিতাস নদী নামে পরিচিত।

(৩) কোম্পানীগঞ্জ- নবীনগর সড়কের প্রায় মধ্যবর্তী স্থানে এবং সড়কের পূর্ব দিকে অবস্থিত পান্ডুগড় গ্রামের নিকট উৎপন্ন হয়ে পূর্বোক্ত সড়ক ভেদ করে পশ্চিম মুখে গিয়ে ধাপতিখোলা ও দীঘির পাড় গ্রামের পাশ দিয়ে গিয়ে পশ্চিম মুখে প্রবাহিত হয়েকামাল্লা গ্রামকে উত্তর পাশে রেখে রামচন্দ্রপুর বাজারের দক্ষিণ দিকে দিয়েউত্তর পশ্চিম মুখী হয়ে বাজারের পশ্চিম পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়ে চিতিগঙ্গানামক তিতাসের সহিত মিশেছে।

তিতাস একটি প্রাচীন নদী। তিতাস নদীর নামে ‘তিতাস গ্যাস’ নামকরণ করা হয়। মানুষের জীবন যাত্রা ও ভূমি গঠনে এ নদীর বিশেষ প্রভাব রয়েছে। তিতাস নদীর ধারা যদিও পরিবর্তিত হয়েছে একাধিক বার। তথাপি এর বিভিন্ন উপ-শাখা নদী চোখে পড়ে। জেলার নদী-তীরবর্তী এলাকাগুলোর মাঝে মাঝেই জেলে সম্প্রদায়ের বাস। তাদের জীবিকা নির্বাহের একমাত্র অবলম্বন মৎস্য শিকার করা। তাছাড়া কৃষকেরা ও নিজেদের খাদ্যের জন্য বিভিন্ন মৌসুমে খালে-বিলে মাছ ধরে থাকেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় প্রচুর হাওড়, খাল-বিল, জলাশয় থাকায় এখানে প্রচুর পরিমাণে মাছ পাওয়া যায়। জেলায় অনেক ছোট-বড় অনেক পুকুর রয়েছে যেখানে দেশী-বিদেশী প্রচুর মাছ চাষ করা হয়।

 

আচিল বা হাঁসলি মোরগ

সরাইলের হাঁসলী মোরগ এর উচ্চতা, ক্ষিপ্রতা, দৈহিক শক্তি ও কস্ট সহিষ্ণুতার জন্য বিখ্যাত। মোঘল আমল থেকে এ অঞ্চলে মোরগ লড়াই চালু হয় বলে জানা যায়। বিশেষ করে সরাইলের দেওয়ানদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় মোরগ লড়াই এ অঞ্চলে বিশেষ তাৎপর্য লাভ করে। দুটি মোরগের মধ্যে অনুষ্ঠিত লড়াইয়ে মোরগের নখগুলোকে চোখা তীক্ষ্ণকরা হয়। যতক্ষণ না একটি মোরগ পরাজিত হচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত লড়াই চলতে থাকে। সরাইলের দেওয়ান মনোয়ার আলী সুদূর ইরান থেকে মতান্তরে রায়বেরেলি থেকে একপ্রকার যুদ্ধবাজ মোরগ দেশে আনয়ন করেন। এ ধরনের মোরগকে হাঁসলি মোরগ বা আসলি মোরগ নামে সবাই চেনে। অত্যন্ত দুধর্ষ ও কষ্ট সহিষ্ণু হিসেবে এদের সুনামআছে। এ মোরগ গুলো যুদ্ধের সময় যে কায়দায় পরষ্পরকে মার দেয় এগুলোর আলাদা নাম আছেদ। যেমন - নিম, কারি, বাড়ি, ফাঁক, ছুট ও কর্ণার। হাঁসলী মোরগ যে গুলোর গলায় পালক থাকে না সে গুলো অত্যন্ত জেদী যোদ্ধা হয়ে থাকে। এগুলো পরাজয় বরণে পিছু হটেনা। শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে থাকে। যোদ্ধা একজোড়া ভাল মোরগের দাম ২৫,০০০/- টাকা থেকে ৩০,০০০/-টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে।

বান্নি/মেলা

বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্যের সঙ্গে মিলেমিশে আছে বিভিন্ন পার্বণ উপলক্ষ্যে মেলা বা লোক জমায়েতের। সম্রাট আকবর যখন নতুন খাজনা আদায়েল ক্যালেন্ডার প্রণয়ন করেন তথন খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে বৈশাখ মাসের ১ তারিখ ক্ষেত্র বিশেষে তারিখ পরিবর্তন করে বিভিন্ন এলাকায় খাজনা আদায় করা হতো। দূরদূরান্তে থেকে আসা লোকজনের খাওয়া দাওয়ার সুবিধার্থে আনুসাঙ্গিক বিভিন্ন পসরা সাজিয়ে বসত ব্যবসায়ীরা। পরবর্তীতে এই জমায়েতটাই একটা উৎসবের রূপ লাভ করে মেলাতে পরিণত হয়। বিভিন্ন ধর্মীয় রাজকীয় বা সামাজিক আচার অনুষ্ঠান যেখানে অনেক লোকের সমাগত হতো এসকলস্থানেই কালক্রমে মেলা জমে উঠে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া অঞ্চলে বিভিন্ন মাজারের উরশ রীফ কে কেন্দ্র করে ২/৩ দিন আবার কোন কোন স্থানে সপ্তাহ ব্যাপী মেলাউদযাপিত হয়। সুদূর প্রাচীন কাল থেকে চলে আসা আমাদের চৈত্র মাসের কৃষ্ণাত্রয়োদশী শতভিষা নক্ষত্র যুক্ত হলে যে বারুনী যোগ হয় এবং সেই যোগে গঙ্গাস্নানের নাম বারুনী স্নান। সরাইল থাকার ধিতপুরেও এ ধরনের বারুনী স্নানঅনুষ্ঠিত হয় বলে গবেষক লুৎফুর রহমান তাঁর বইয়ে উল্লেখ করেছেন। ভাদুঘরের বান্নী ১৪ বৈশাখ প্রতিবৎসর অনুষ্টিত হয়ে আসছে। বারুনী স্নান নামক যে ধর্মীয় আচারকে উপলক্ষ্য করে ভাদুঘরের বান্নী হয়েছে তা আসলে কতটুকু বারুনী স্নানকে কেন্দ্র করে হয়েছে তা প্রশ্নযুক্ত। অনেকে মনে করেন ভাদুঘরের মেলা খাজনা আদায়কে উপলক্ষ্য করেই অনুষ্ঠিত হয়ে থাকবে। তবে যে কোন উপলক্ষ্যেই মেলার প্রচলনটি শুরু হোক না কেন একথা আজ অনস্বীকার্য বর্তমান সময়েও এইমেলার আয়োজনে কোন ব্যত্যয় ঘটেনি এবং সকল ধর্মীয় লোকজনের এক মহামিলনে রূপান্তরিত হয়েছে এই মেলা। মেলা উপলক্ষ্যে ভাদুঘর এবং আশেপাশে গ্রামসমূহে এক উৎসব মুখর পরিবেশ বিরাজ করে। দূর দূরান্ত থেকে এ সকল গ্রামের অধিবাসীদের আত্মীয় স্বজন বিশেষ করে মেয়েরা নাইওরী ও পুত্র বধুদের আত্মীয়স্বজনদের অন্ততঃ এক সপ্তাহ আগেই নিমন্ত্রণ করে আনা হয়। স্বতঃস্ফূর্তভাবে এই বিশাল মেলা অনুষ্ঠিত হয়।

 

পুতুল নাচ

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পুতুল নাচও ছিল দেশ বিখ্যাত। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় প্রথম পুতুল নাচ সৃষ্টিকরেছিলেন নবীনগর থানার কৃষ্ণনগর গ্রামের বিপিন পাল। তিনি হিন্দু ধর্মের বা পৌরাণিক কাহিনী অবলম্বনে নিজস্ব স্টাইলে পুতুল নাচ করতেন। তাঁকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ব্যবসায়িক পুতুল নাচের স্রষ্টা বলা হয়। বর্তমানে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এই ঐতিহ্যবাহী পুতুল নাচকে বাঁচিয়ে রেখেছেন শহরের মেড্ডারধন মিঞা। তিনি কৃষ্ণনগর গ্রামের গিরীশ আর্চাযের পুতুল নাচের দলে পুতুলনাচের তালে তালে গান করতেন। শেষ পর্যন্ত ধন মিঞা নিজেই পুতুল নাচের দল সৃষ্টি করেন। ১৯৭৫সনে ধন মিঞা টেলিভিশনে ধন মিঞা পুতুল নাচে যে কাহিনী গুলি প্রদর্শন করেছিলেন তা হচ্ছে ‘বড়শি বাওয়া’‘বাঘে কাঠুরিয়াকে ধরে নেওয়া’এবং ‘বৈরাগী বৈরাগিনীর ঝগড়া’অন্যতম। ধন মিঞা শুধু দেশে নয়, বিদেশেও খ্যাতি অর্জন করেছে। তিনি ১৯৮০ সনে পুতুল নাচ দেখাতে সোভেয়িত ইউনিয়নে গিয়েছিলেন। তাঁরসাথে মোস্তফা মনোয়ারও গিয়েছিলেন। ধন মিঞা রাশিয়ার মস্কো, তাসখন্দ, সমরখন্দ প্রভৃতি শহরে ২০ দিন অবস্থান করে পুতুল নাচ দেখিয়ে অকুণ্ঠ প্রশংসা পেয়েছিলেন। বর্তমানে তিনি আধুনিক মডেলে পুতুল তৈরি করছেন। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের প্রচারে পুতুল নাচকে ব্যবহার করেছেন।

 

নৌকা বাইচ

‌‘‘সখি করি গো মানা, কালো জলে ঢেউ দিওনা গো

সখি কালো জলে ঢেউ দিও না’’

উল্লিখিত গানের কলিটি ইংরেজ আমলে তিতাস নদীর নৌকা বাইচের একটি গানের অংশ। সুদূর অতীতকাল থেকে মনসা পূজা উপলক্ষে ভাদ্র মাসের প্রথম তারিখে তিতাসে এ নৌকা বাইচ অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। এ অনুষ্ঠানটির প্রাচীনতা সর্ম্পকে ত্রিপুরা জেলা গেজেটীয়ার থেকে জানা যায় যে, ১৯০৮ সালে অনুষ্ঠিত নৌকা বাইচ ছিল একটি ঐতিহাসিক প্রতিযোগিতা। ঐ প্রতিযোগিতায় আখাউড়া, আশুগঞ্জ, চান্দুরা এবং কুটির ইংরেজ পাট ব্যবসায়ীরা বহু সোনার মেডেল দিয়ে নৌকা বাইচ প্রতিযোগীদের পুরষ্কৃত করেছিলেন। তাছাড়া কুমিল্লা জেলা গেজেটীয়ার থেকে বৃটিশ শাসনামলে নৌকা বাইচ সর্ম্পকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তৎকালীন মহকুমা প্রশাসক মি: ওয়ারস এর রিপোর্টের বর্ণনায় আরো জানা যায় যে, এখানে নিয়ম-দস্তুর মাফিস কোন নৌকা বাইচ অনুষ্ঠিত হতো না। সাধারণ একটি নৌকা আর একটি নৌকাকে চ্যালেঞ্জ দিত এবং দাঁড়িরা তালে তালে দাঁড় ফেলে পাল্লাদিয়ে নৌকা চালিয়ে নিয়ে যেত। একটি নৌকা আর একটি নৌকাকে পেছনে ফেলে দিতে পারলেই তার জিত হতো। ১৯০৮ সালে কিন্তু আখাউড়ার কয়েকটি পাট কোম্পানির দেওয়া স্বর্ণপদকের জন্য দস্তুরমত নৌকা বাইচ হয়েছিল এবং তাতে এমন ভীষণ উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছিল যে, পুলিশকে বহু কষ্টে শান্তি রক্ষা করতে হয়েছিল।

ত্রিশের দশকেও ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহর সংলগ্ন তিতাসের বুকে অতি জাঁকজমকের সাথে গণউৎসবএ নৌকা বাইচ অনুষ্ঠিত হতো।  বিজয়ী নৌকাকে মেডেল, কাপ, শীল্ড, পেতলের কলস, পাঁঠা ইত্যাদি ট্রফি দেয়া হতো। নৌকা বাইচ উপলক্ষে লঞ্চ, বিভিন্ন ধরনের নৌকা, কোষা, কলা গাছের ভেলা এমন কি, মাটির গামলাকে পর্যন্ত  রং-বেরঙের কাগজের ফুল ইত্যাদি দিয়ে বিচিত্র সাজে সজ্জিত করা হতো।

 

মিষ্টি, ছানামুখী
বৃটিশ রাজত্বকালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মিষ্টি, ছানামুখি এর সুখ্যাতি দেশ বিদেশে ছড়িয়ে পড়েছিল। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মিষ্টির সুনামের পেছনে যে ব্যক্তির নাম জড়িত তিনি হলেন মহাদেব পাঁড়ে। তাঁর জন্ম স্থান কাশী ধামে। তাঁর বড় ভাই দুর্গা প্রসাদ কিশোর মহাদেবকে নিয়ে কলকাতায় আসেন। বড় ভাই এর মিষ্টির দোকানে মিষ্টি তৈরি শুরু করেন বালক মহাদেব। কিন্তু অসময়ে বড় ভাই দুর্গা প্রসাদ পরলোক গমন করেন। নিরাশ্রয় হয়ে মহাদেব বেড়িয়ে পড়লেন নিরুদ্দেশে। অবশেষে এলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরে। শতাধিক বছর পূর্বে তখন শহরের মেড্ডার শিবরাম মোদকের একটি মিষ্টির দোকান ছিল। তিনি মহাদেবকে আশ্রয় দিলেন। মহাদেব আসার পর শিবরামের মিষ্টির সুনাম ছড়িয়ে পড়ে। মৃত্যুর সময় শিবরাম তাঁর মিষ্টির দোকানটি মহাদেবকে দিয়ে যান। জানা যায় যে, ভারতের বড়লাট লর্ড ক্যানিং এর জন্য একটি বিশেষ ধরনের মিষ্টি তৈরি করে পাঠানো হয়েছিল কলকাতায়। লর্ড ক্যানিং এবং স্ত্রী লেডী ক্যানিং এ মিষ্টি খেয়ে খুব প্রশংসা করেছিলেন। এরপর এ মিষ্টির নাম রাখা হয় ‘লেডি ক্যানিং’ মিষ্টি। বর্তমানে যা ‘লেডি ক্যানি’ নামে পরিচিত। তাঁর তৈরি আর একটি মিষ্টির নাম ‘ছানামুখী’। এ ছানামুখী বাংলাদেশের অন্য কোথাও তৈরি করতে পারে না। এ ছানামুখীর সুনাম এখনও দেশ বিদেশে অক্ষুণ্ন রয়েছে। ১৯৮৬ সনে ইসলামাবাদে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত অফিসে বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবসের এক অনুষ্ঠানে তৎকালীন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল জিয়াঊল হক ব্রাহ্মণবাড়িয়ার লেডী ক্যানি খেয়ে উচ্ছ্বসিত প্রশংখা করেছিলেন যা পাকিস্তানের বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল।

 

 

ফেনী জেলাঃ

ফেনী জেলার ভূ-প্রকৃতি ও ভৌগলিক অবস্থান, বঙ্গোপসাগরের নোনা জল, পীর-ফকিরের প্রভাব এবং পূর্বপুরুষের বীরত্ব গাঁথা এই জেলার মানুষের ভাষা ও সংস্কৃতি গঠনে প্রভূত ভূমিকা রেখেছে । বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলে অবস্থিত এ জেলাকে ঘিরে রয়েছে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য, কুমিল্লা, নোয়াখালী ও চট্টগ্রাম । দক্ষিণে রয়েছে বঙ্গোপসাগর এর বৈচিত্র্যময় জলরাশি। এখানে ভাষার মূল বৈশিষ্ট্য আবেগ প্রবণতায় অপরকে আপনীকরণের প্রচেষ্টা,এর মাঝে ও ভাষায় কিছুটা বৈচিত্র্য খুঁজে পাওয়া যায়। যেমন ফেনীর কথ্য ভাষায় মহাপ্রাণ ধ্বনিসমূহ উচ্চারণের ক্ষেত্রে বায়ুপ্রবাহের চাপ কম থাকায় মহাপ্রাণ ধ্বনিসমূহ অল্পপ্রাণ ধ্বনির মত উচ্চারিত হয় আবার অল্পপ্রাণ ধ্বনিসমূহ উচ্চারণের ক্ষেত্রে বায়ুপ্রবাহের চাপ বেশি থাকায় অল্পপ্রাণ ধ্বনিসমূহ মহাপ্রাণ ধ্বনির মত উচ্চারিত হয় ।  বর্ণ উচ্চারণে সহজতর বর্ণ ব্যবহার করা হয় অধিক হারে এবং প্রয়োজনে বর্ণকে ভেঙে কাছাকছি অবস্থান উচ্চারণ অবস্থান বেছে নেওয়া হয় অর্থাৎ ভাষা সহজীকরণের প্রবণতা সুস্পষ্ট। এর অন্যতম আরেকটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে বাংলাদেশের যে কোন অঞ্চলের মানুষ ফেনীর আঞ্চলিক ভাষাকে সহজভাবে বুঝতে পারে এবং সহজেই এ আঞ্চলিক ভাষাটিকে নিজের কন্ঠে ধারণ করতে পারে। ফেনীর আঞ্চলিক ভাষার সাথে  কুমিল্লা অঞ্চলের চৌদ্দগ্রাম ও লাকসাম উপজেলার আঞ্চলিক ভাষার এবং চট্রগ্রাম অঞ্চলের মিরেরশ্বরাই, বারইয়ারহাট অঞ্চলের আঞ্চলিক ভাষার মিল সুস্পষ্ট । নোয়াখালি ও লক্ষীপুর এলাকার ভাষার অনেকটাই সাযুজ্য রয়েছে ফেনীর আঞ্চলিক ভাষার সাথে । ফেনী-মুহুরী-কহুয়ানদীর  গতিপ্রকৃতি ও ছোট ফেনী-কালিদাস-পাহালিয়া খালের খরস্রোত, নদীভাঙন, বন্যা, চরাঞ্চল এবং বঙ্গোপসাগরের নোনা হাওয়া,ছাগলনাইয়া অঞ্চলের পাহাড়ী লালমাটি ফেনী জেলার  মানুষের আচার-আচরণ, খাদ্যাভ্যাস, ভাষা, সংস্কৃতিতে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। এ অঞ্চলের মানুষগুলো ধর্মভীরু-সহজ-সরল-আতিথ্যপ্রবণ। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এ অঞ্চলের মানুষের মজ্জাগত। আঞ্চলিক সংস্কৃতিতে মুখে মুখে ছড়াকাটা, ধাঁধাঁ, বচন ইত্যাদি প্রচলিত। প্রাচীন ভূলভূলাইয়া নদীর (বর্তমানে অস্তিত্বহীন) তীরবর্তী মানুষগুলোর বাণিজ্যযাত্রা ও বণিকের নিয়তি ও প্রেমকাহিনী নিয়ে রচিত ভূলুয়ার পালা এ অঞ্চলের প্রাচীন সংস্কৃতির নিদর্শন। পালা গান,কবি লড়াই, ঢাকী নৃত্য এর পাশাপাশি পুঁথিসাহিত্যে শমসের গাজির কিচ্ছা, ভূলুয়ার কিচ্ছা সুপরিচিত।

 

চাঁদপুর জেলাঃ

চাঁদপুর- এর কচুয়া, হাজীগঞ্জ উপজেলার কিছু অংশ ও শাহরাস্তি উপজেলার মেহের শ্রীপুর অঞ্চলটি সবচেয়ে প্রাচীন। বাংলার সুলতান ফখরউদ্দিন মুবারক শাহ্ এর রাজত্বকালে (১৩৩৮-১৩৪৯) দেওয়ান ফিরুজ খান লস্কর এর খনন করা দীঘির পশ্চিম পাড়ে ৭৭৫ হিজরীতে একটি মসজিদ স্থাপন করা হয়। এ মসজিদই সম্ভবত বৃহত্তর কুমিল্লা জেলার সর্ব প্রাচীন মসজিদ। এটি হাজীগঞ্জ উপজেলার সামান্য উত্তরে পিরোজপুর গ্রামে অবস্থিত। চাঁদপুর জেলার ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে হাজীগঞ্জ এক গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। হাজী মনিরুদ্দিন শাহ (মনাই গাজী) এর হাজী দোকান এর সুখ্যাতিতে গড়ে উঠা বাজার থেকে হাজীগঞ্জ শব্দের উৎপত্তি ঘটে। জেলার ধর্মীর প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অন্যমত হাজীগঞ্জে অবস্থিত ঐতিহাসিক বড় মসজিদ স্থাপিত হয় ১৩০০ বঙ্গাব্দে (১৮৯৩ খ্রিঃ)। হাজীগঞ্জের ৬ মাইল পশ্চিমে অলিপুর গ্রাম। এ গ্রামে দুটি প্রাচীন মসজিদ আছে। একটি শাহ সুজার আমলে নির্মিত সুজা মসজিদ। অপরটি মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেবের আমলে নির্মিত আলমগীর মসজিদ নামে পরিচিত। এটি নির্মাণ করেছিলেন ১৩৭০ খ্রিঃ মোঃ আবদুল্লাহ। আলীগঞ্জের মাদা্হ খাঁ নামের এক দরবেশের নামে ১৭৩৮ খ্রিঃ স্থাপিত হয় বর্তমান মাদা্হ খাঁ মসজিদ।

 

১৩৫১ সালে মেহের শ্রীপুর অঞ্চলে এসেছিলেন বিখ্যাত আউলিয়া হযরত রাস্তি শাহ। ১৩৮৮ খ্রিঃ তিনি ইন্তেকাল করেন। মেহের শ্রীপুর-এ তাঁর মাজার অবস্থিত। বিখ্যাত হিন্দু সাধক সর্বানন্দ ঠাকুর এ মেহেরেই দশ মহাবিদ্যা সিদ্ধি লাভ করেছিলেন। সিদ্ধি লাভের স্থানটিতেই গড়ে উঠেছে মেহের কালবাড়ী। হযরত রাস্তি শাহ্ এর নামেই এ অঞ্চলের নাম হয় শাহ্রাস্তি। এটিই এখন শাহ্রাস্তি উপজেলা নামে পরিচিত।

 

বাঙালি জাতির অনেক উৎসব আয়োজনের সঙ্গে মিশে আছে মেলা বা আড়ং- এর ঐতিহ্য। চাঁদপুরেও বেশ কিছু প্রাচীন ও স্বাধীনতাত্তোর কালে সৃষ্ট মেলার অস্তিত্ব পাওয়া যায়। উপজেলা ভিত্তিক উল্লেখযোগ্য মেলাসমূহের বর্ণনা নিম্নে দেওয়া হলোঃ

মুক্তিযুদ্ধের বিজয় মেলাঃ

বিজয় দিবসকে চির স্মরনীয় করে রাখার জন্য চাঁদপুর হাসান আলী সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সম্মুখস্থ হাসান আলী সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠে মুক্তিযুদ্ধের বিজয় মেলার আয়োজন করা হয়। এ মেলা হয় প্রতিবছর ডিসেম্বর মাসের ১ম সপ্তাহে আরম্ভ হয়। চলে এক মাস। ১৯৭১ সালের ৮ ডিসেম্বর চাঁদপুর শহর পাকবাহিনী মুক্ত হয়। ১৯৯২ সালে ৮ ডিসেম্বর বিজয় মেলা আরম্ভ হয়। মুক্তিযুদ্ধের বিজয় মেলায় মুক্তিযুদ্ধে বীরত্ব রাখা এবং বিশিষ্ট বিদগ্ধ ব্যক্তিদের আমন্ত্রণজানানো হয়। তাঁরা মেলায় মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ করেন এবং মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন ইতিহাস জনসমক্ষে তুলে ধরেন। মুক্তিযুদ্ধের বিজয় মেলায় শিশু খেলনা হতে আরম্ভ করে মহিলাদের বিভিন্ন তৈজসপত্রসহ বিভিন্ন খাদ্য সামগ্রী পাওয়া যায়। প্রতিবছর সেপ্টেম্বর, অক্টোবর মাসে মুক্তিযুদ্ধের বিজয় মেলার নতুন কমিটি গঠন করা হয়। বিজয় মেলা কমিটিই এ মেলার আয়োজক। 

মেহেরনের রথের মেলা ঃ

প্রতি বছর মতলবের মেহেরন হিন্দু সম্প্রদায়ের রথযাত্রা উপলক্ষে ঐতিহাসিক মেহেরন রাধকৃঞ্চ মন্দির প্রাঙ্গuঁণ মেলা বসে। প্রতি বৎসর জুলাই মাসে রথযাত্রা কমিটি রথ মেলা আয়োজন করে থাকে। মেলায় বিভিন্ন রকমের শিল্পজাত দ্রব্য সামগ্রী যেমন মাটির পুতুল, হাঁড়ি পাতিল, বিভিন্ন ধরনের খেলনা, কাঠ, বাঁশ ও বেতের তৈরী জিনিস পত্র পাওয়া যায়।

 ঐতিহ্যবাহী লেংটার মেলা ও অন্যান্য মেলাঃ

মতলব উত্তর উপজেলায় উত্তরাংশ অর্থাৎ মেঘনা ধনাগোদা নদী বেষ্টিত দ্বীপাঞ্চল  (মেঘনা নদীর পশ্চিমাংশসহ) ২০০০ সালে ‘‘মতলব উত্তর’’ উপজেলা নামে নতুন উপজেলা গঠিত হলেও শত শত বছর ধরে এই অঞ্চলে বছরের বিভিন্ন সময় বিভিন্ন স্থানে মেলার আয়োজন করা হয়। গ্রাম বা সমাজ নেতৃত্বদানকারী ব্যক্তিদের উদ্যোগে এই মেলা অনুষ্ঠিত হয়। কিছু কিছু মেলা অনুষ্ঠিত হয় পীর, আওলিয়া,  দরবেশ, ফকিরদের অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে। এদের মধ্যে লেংটা বাবা (সোলেমান শাহ)’র মাজার বদর পুর পুলিশ ফকিরের দরগাহ (গজরা), আইন উদ্দিন শাহ’র মাজার, বড় হলদিয়া মেলা অন্যতম। সবচেয়ে  সুপরিচিত হলো লেংটা বাবার মাজারে অনুষ্ঠিত মেলা। সারা দেশ থেকে লেংটা ভক্তবৃন্দ এখানে আসেন। প্রতি বছর ভাদ্র মাসের ১৮-২১ তারিখ পর্যন্ত ০৪ দিন এবং চৈত্র মাসের ১৫-২২ তারিখ পর্যন্ত এই  ৮ দিন মেলা চলে। মেলায় যাত্রা ও আকর্ষণীয় সার্কাস দেখানো হয়।

           মেলায় তাঁত, কামার-কুমারদের তৈরী বিভিন্ন দ্রবাদি কেনা বেচা হয় এবং বিভিন্ন প্রকার খেলনা ও হরেক রকমের খাবার পাওয়া যায়। এ ছাড়া ৩০ শে চৈত্র এবং পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে এলাকার হাট/ বাজারসহ বিভিন্ন গুরুত্বপুর্ণ স্থানে মেলা অনুষ্ঠিত হয়। এ সকল মেলায় বিভিন্ন প্রকার খাবার, নিত্য ব্যবহার্য দ্রব্য ও খেলনা পাওয়া যায়। বহু পূর্বে রাঢ়ীকান্দি গ্রামে মেলা হতো এবং এ মেলায় ঘোড়াদৌড় প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হতো। এ মেলার প্রধান বৈশিষ্ট হচ্ছে মেলাটি ‘বট’ গাছের নীচে অনুষ্ঠিত হতো।

 

চাঁদপুর জেলার লোকশিল্প ও চারুকলাসমূহঃ

কুমারঃ এ সম্প্রদায় আর আগের মত তাদের পূর্ব পুরুষদের ব্যবসা আকঁড়িয়ে নেই। পূর্বের ন্যায় কুমার সম্প্রদায়ের লোকদের হাuঁড়-কলসি বানানো দৃশ্য সচরাচর চোখে পড়ে না। সিলভারের তৈজস সামগ্রী তাঁদের তৈরী পণ্যের স্থান দখল করায় অনেকে তাঁদের পূর্ব পুরুষদের ব্যবসা ছেড়ে দিয়ে অন্য পেশায় জড়িয়ে  পড়েছে। চাঁদপুর সদরের তবপুরচন্ডী ইউনিয়নে এবং পুরান বাজারে এখনও বেশ কিছু কুমার রয়েছে।

 

কামারঃ কামার সম্প্রদায় এখনও তাদের পূর্ব পুরুষদের ব্যবসা আকঁড়িয়ে আছে। তাদের তৈরি দা, বটি বর্তমানে সকল শ্রেণীর মানুষের কাছে সমানভাবে সমাদৃত। অল্প সংখ্যক কামার সম্প্রদায়ের লোক তাদের পূর্ব পুরুষদের পেশা ছেড়ে দিয়ে অন্য পেশায় জড়িয়ে পড়েছে।

 

নোয়াখালী জেলাঃ

আর্থসামাজিক-রাজনৈতিক-ভৌগোলিক বহুবিধ অনুষঙ্গের কারণে অঞ্চলবেধে সংস্কৃতি ভিন্ন ভিন্ন মাত্রা রুপ পরিগ্রহ করে। তাই একটি দেশের সামগ্রিক লোকসংস্কৃতি এবং একটি বিশেষ অঞ্চলের লোকসংস্কৃতিতেও অনেক পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। নোয়াখালী জেলা প্রাচীন সমতট জনপদের একাংশ। তাই স্বাভাবিকভাবেই জেলার লোকসংস্কৃতিতে তার একটি পরিচ্ছন্ন ছাপ পরিলক্ষিত হয়। বহু ভাঙ্গা-গড়া, চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে আজকের নোয়াখালী যা এক সময় সম্ভাবনাময় সমৃদ্ধ জনপদ ছিল। এ অঞ্চলের লোক সংস্কৃতির প্রতি একটু ঘনিষ্ট হলে সহজেই অনুমান করা যায় যে, এ অঞ্চলের একটি সমৃদ্ধ লোক সংস্কৃতির পরিমন্ডল রয়েছে। লোক সংস্কৃতির একটি প্রধানতম শাখা লোকসাহিত্য। নোয়াখালীর লোক সাহিত্য এ দেশের অন্যান্য অঞ্চলেরতুলনায় অনেকটা সমৃদ্ধ এবং জীবন ঘনিষ্ঠ; তা এ অঞ্চলের প্রবাদ-প্রবচন, আঞ্চলিক গান, ধাঁ-ধাঁ, ছড়া থেকে সহজেই অনুমেয়। নিম্নেরআলোচনায় এর স্বরুপ কিছুটা উম্মোচিত হবে।

 

প্রবচনের কথাই ধরা যাকঃ“মাইনষের কুডুম আইলে গেলে, গরুর কুডুম লেইলে হুঁইছলে”এ প্রবচনটি গুঢ়ার্থ হলো মানুষের কুটুম্বিতা তথা আতিথেয়তা বুঝা যায় পরস্পরের আসা যাওযার মাধ্যমে আর গরুর তা বোঝা যায় লেহনের মাধ্যমে। এ প্রবচনের অর্থের সাথে এ অঞ্চলের সাধারণ মানুষ যে ঐতিহ্যগতভাবেই আত্মীয় বৎসল তা বুঝতে বাকী থাকার কথা নয়।“ ঝি থাইকলে জামাইর আদর, ধান থাইকালে উডানের আদর”-এ প্রবচনটির সরল অর্থ হচ্ছে কন্যার কারণেই মানুষ কন্যা জামাতাকে খাতির করে আর ধান প্রক্রিয়াজারকরণের প্রযোজনীয়তা হেতুই মানুষ উঠানের যত্নকরে।

 প্রত্যাহিক জীবনের নানা উপকরণ নিয়ে রয়েছে হাজারো বৃদ্ধিদীপ্ত মুখরোচক ধাঁধাঁ। এছাড়াও বিভিন্ন আচার অনুষ্ঠানে জীবনের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাকে নিয়ে দেখা যায় শত শত ছড়া, পদ-পদ্য এমনি প্রশ্নোত্তর ভিত্তিক একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে ব্যবহৃত ছড়া হচ্ছে-আচ্ছালামালাইকুম এয়, দুলা আইছে বিয়া কইত্তো আন্নেরা আইছেন কেয়া। উত্তরে-“ওআলাইকুম আচ্ছালাম ওবা, দুলা আইছে কিয়া কইত্তো আমরা আইছি শোবা”। রয়েছে ছেলে ভুলোনো ছড়া-“ঝিঁঅ ঝিঁঅ মাগো হেঁএলা খাইতাম গেলাম গো/কাঁডা হুঁড়ি মইল্যাম গো/ কাঁডায় লইল শুলানী/ বুড়িয়ায় লইল দৌড়ানি“। এ সকল থেকে এটা সহজেই বুঝা যায় যে, এ অঞ্চলের মানুষ ঐতিহ্যগতভাবেই রসপ্রিয় এবং তাদের রসবোধ জীবন ঘনিষ্ঠ এবং একান্ত নিজেদেরই মত। আজকের আকাশ সংস্কৃতির বদৌলতে আমরা বহু বিষযেই বিস্মৃত হচ্ছি। যাত্রা, পালাগান এসবই আজ সেকেলে ও অনাধুনিক। কিন্তু সেল্যুলয়েডে বন্দী জীবনাংশের তুলনায় এ অঞ্চলেরনট-নটীদের নান্দনিক উপস্থাপনায় এখনো গ্রামে গঞ্জে মানুষকে পুরোরাত জেগে যাত্রা পালা শুনতে কম বেশি দেখা যায় বৈকি। রঙমালা চৌধুরীর পালা, বেদের মেয়ে ইত্যাদি এ অঞ্চলের মৌলিক রচনা ও উপস্থাপনা। কিং এডওয়ার্ড আর সিম্পসনের প্রণয় “চৌধুরী রঙমালা” র প্রণয় অপেক্ষা শক্তিশালী বলে বিশ্বাস করার কোন কারণ নেই। লোক-সাহিত্যের কথা বাদ দিলেও এ অঞ্চলের জন জীবনে যে ঐতিহ্য লালিত তার শিল্প বোধ ঈর্ষণীয় বলতে হবে। আপনি যদি নাগরিক সংস্কৃতির বলয় থেকে বেরিয়ে গ্রামে ঘুরেতে যান, আতিথ্য গ্রহণ করেন, আপনার দৃষ্টিতে গেঁয়ো কোন মানুষের আতিথ্যে মুগ্ধহবেনই। শুরু থেকে ফেরা পর্যন্ত আপনি পাবেন নানা ঐতিহ্যের স্বাক্ষর। দেখবেন আপনাকে বসার জন্য যে পাটি বা বিছানা দেয়া হয়েছে তাতে রয়েছে যত্নে বোনা কারুকর্ম। হয়তো তারই ওপর বিছিয়ে দেয়া হয়েছে একখানা চাদর যাতে যতেণ করা সুচিশিল্প কিংবা এককোণে সুই সুতায় আঁকা বিচিত্র বনফুল আপনাকে আকৃষ্ট করবে। ক্ষণিকের জন্য আপনি হযতো ভাববেন বাহ্ বেশতো। আমাদের মায়েদের-মেয়েদের ঐতিহ্যগত শিল্পবোধ আপনাকে আড়োলিত করবে। হয়তো কেবল পাটালী গুড় আর শুকনো মুড়িই দেয়া হলো আপনাকে তাৎক্ষণিকভাবে; দেখবেন যে টুকরিতে বা সাজিতে তা দেয়া হবে তাতে রয়েছে নিপুণ কারুকাজ খচিত। ধাতব পানদানে কিংবা বেত, আতি, সুতো ইত্যাদি সমন্বয়ে বানানো পানদানে আপনাকে দেয়া হবে পান। দৃষ্টি থাকলে আপনি খুঁজে পাবেন আমাদের হাজারো বছরের লালিত ঐতিহ্য। লাঙ্গল-জোয়াল, কোদাল-কাস্তে, টুকরি-সাজি, যেটার দিকেই তাকান না কেন আমাদের ঐতিহ্যগত শিল্পরসের একটি নমুনা আপনাকে আকৃষ্ট করবেই। গোপাল হালদারের কথায় তাই একমত পোষণ করে বলতে হয় “চারু ও কারু কলা দু'ই সংস্কৃতির পরিচয় দেয়”। আর এ পরিচয়ের দিক থেকে আমাদের লোক ঐতিহ্য লোকসংস্কৃতি হাজারো বছরের অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ ও শোভন।

রাঙ্গামাটি জেলাঃ   

নৃ-বৈচিত্র্যে অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছে দেশের দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত পার্বত্যাঞ্চলে। এখানে দীর্ঘদিন ধরে এগার ভাষাভষীর 12টি জাতিসত্ত্বা সহাবস্থান করছে। এমন বৈচিত্র্যে ঐক্যতান বিশ্বের কোন দেশে চোখে পড়ে না। এ পাহাড়ি ভূ-ভাগে এতগুলো জাতিসত্ত্বা কখন ,কিভাবে অভিবাসন করেছে তা বলা মুশকিল। কোন জাতিসত্তার কোন লিখিত দলিল দস্তাবেজ না থাকায় এতদঞ্চলের সঠিক ইতিহাস জানার কোন সুযোগ নেই। তবে এসব জনজাতিগুলোর রয়েছে সমৃদ্ধ ঐতিহ্য। তারা সেগুলোকে যুগ যুগ ধরে সযতনে লালন করে আসছে। 

ভাষা:

 

জনবৈচিত্র্যর এক অনন্য মিলন ক্ষেত্র রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা । এখানে দশভাষাভাষি এগারটি জাতি সত্ত্বার বসবাস রয়েছে। এরা হচ্ছে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যা, ম্রো, চাক, খিয়াং, খুমী, পাংখোয়া, বোম ও লুসাই। ভাষাও সংস্কৃতির বিচারে এক জাতিসত্ত্বা অন্য জাতিসত্ত্বা থেকে স্বতন্ত্র।নৃতাত্ত্বিক বিচারে তাদের সকলেই মঙ্গোলীয় জনগোষ্ঠিভুক্ত। সংখ্যাগরিষ্ঠতারদিক থেকে ‘চাকমা’হচ্ছে প্রধান জাতিসত্ত্বা। তাদের পরেই মারমা, ত্রিপুরা ওতঞ্চঙ্গ্যাদের অবস্থান। অন্যান্য সাতটি জাতিসত্ত্বার সংখ্যা অতি নগন্য।তারা রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলার মোট জনসংখ্যার ১.২৭% মাত্র।

এতদঞ্চলেবসবাসরত প্রত্যেক জাতিসত্ত্বার রয়েছে নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি। এদের মধ্যেচাকমাদের রয়েছে নিজস্ব বর্ণমালা। মারমারা বর্মী বর্ণমালায় লেখার কাজ চালায়।তাদের লোক সাহিত্যও বেশ সমৃদ্ধ। লোক সাহিত্যের মধ্যে রয়েছে প্রবাদ-প্রবচন(ডাগকধা), ধাঁধাঁ (বানা), লোককাহিনী, ছড়া উভগীদ ইত্যাদি। এগুলোর ব্যবহার ওরচনা শৈলী বেশ চমকপ্রদ। লোককাহিনীর বুননেও উৎকর্ষতার ছাপ রয়েছে। চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরারা আধুনিক সাহিত্য চর্চায়ও অনেকটা এগিয়েছে। তারা নিজেদেরভাষায় কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ ইত্যাদি রচনা করছে।

সংস্কৃতি:

এতদঞ্চলেরআদিবাসী সংস্কৃতি অত্যন্ত উজ্জ্বল এবং বৈচিত্রময়। এখানকার ১১টি জাতিসত্তার বিশাল সংস্কৃতির ভান্ডার রয়েছে।তারা পূর্বপুরুষদের সংস্কৃতির ধারাপরম মমতায় যুগ যুগ ধরে রক্ষা করে চলেছে। আধুনিক শিক্ষা, মোঘল-ইংরেজ-বাঙালিসংস্কৃতির ছোঁয়া, নগরায়ন ও আকাশ সংস্কৃতি আদিবাসীদের সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলকেযথেষ্ট প্রভাবিত করেছে তা ঠিক। এতে তাদের ভাষা, পোশাক, আহার ও জীবন ধারায়পরিবর্তনও লক্ষনীয়। তা সত্ত্বেও সংস্কৃতির বিচারে তাদের এখনো আলাদাভাবেচেনা সম্ভব। এ ধারা আরো অনেকদিন অব্যাহত থাকবে তা নির্দ্বিধায় বলা যায়।

পার্বত্যউপজাতি জনগোষ্ঠির মধ্যে বৌদ্ধ, সনাতন, খ্রিস্টান ও ক্রামা ধর্ম প্রচলিত।এখানে আচার সংস্কার বিষয়ে বেশ কিছু টোটেমিক ধারণা প্রতিষ্ঠিত। মন্দিরেরপুরহিতদের পাশাপাশি পাহাড়ি ওঝা, বৈদ্য ও তান্ত্রিকদের প্রভাবও লক্ষ করাযায়। সমাজে প্রতিষ্ঠিত প্রাচীন রীতিনীতি মেনে চলে সবাই। লোক সংস্কার ও লোকবিশ্বাসকে মনে প্রাণে ধারণ করে সেটা থেকে শুভ-অশুভকে বিচার করা হয় কখনওকখনও। তবে বর্তমানে কুসংস্কারগুলো ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে।

পোশাক-পরিচ্ছদও অলংকার ব্যবহারের ক্ষেত্রে পার্বত্য আদিবাসীদের শিল্পমননশীলতার পরিচয়মেলে। চাকমাদের পিনন-খাদি, মারমাদের লুঙ্গি-থামি, ত্রিপুরাদের রিনাই-রিসাউৎকৃষ্ট শিল্পকলার পরিচয় বহন করে। সুদূর অতীতে মেয়েদের শুধু রূপার গহনাপরতে দেখা যেত। লুসাই, পাংখো ও বম মেয়েরা পরতো   বাঁশ-কাঠের অলংকার। আবার কেউকেউ পুঁতির মালা কিংবা মুদ্রার মালা   পরতো। কানে পরতো দুল আর ঝুমকো।পুরুষরা পরতো মালকোচা ধুতি এবং লম্বা হাতা জামা। বর্তমানে পেশাক-পরিচ্ছদেবেশ পরিবর্তন এসেছে। এখন সকল জাতিসত্তার মেয়েদের সালোয়ার-কামিজ, শাড়ি-ব্লাউজ এবং পুরুষদের পেন্ট-শার্ট পরতে দেখা যায়।

 

পার্বত্যচট্টগ্রামের প্রধান সামাজিক উৎসব ‘বিজু-সাংগ্রাই-বৈসুক’। চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা ও তঞ্চঙ্গ্যারা বর্ষ বিদায় ও নববর্ষের আগমণ উপলক্ষে তিনদিনব্যাপী এউৎসব পালন করে। এ বিষয়ে ‘ঐতিহ্য’নামক কনটেন্টে বর্ণনা করা হয়েছে।চাকমাদের ‘হাল পালানী’উৎসব কৃষি ভিত্তিক। এ সময় হালচাষ বন্ধ রাখা হয়ঋতুমতী জমির উর্বরা শক্তি বৃদ্ধির বিষয়টি বিবেচনা করে। মারমাদের‘ছোয়াইংদগ্রী লং পোয়েহ’ও ‘রথটানা’উল্লেখযোগ্য। ‘খিয়াং উপজাতিদের প্রধানউৎসব ‘হেনেই’। আর ‘লুসাইদের নবান্ন উৎসবের নাম ‘চাপ চার কুট’। ম্রোদেররয়েছে ‘গো-হত্যা’উৎসব। বর্তমানে ‘কঠিন চীবর দান’প্রধান ধর্মীয় উৎসবেপরিণত হয়েছে।

চাকমাদেরজনপ্রিয় নৃত্য হচ্ছে ‘জুমনৃত্য’। ত্রিপুরাদের ‘গরাইয়া নৃত্য’বৈসুক উৎসবেঅনুষ্ঠিত হয়। লুসাইদের লোকনৃত্যের মধ্যে ‘বাঁশ নৃত্য’ইতোমধ্যে জনপ্রিয়তালাভ করেছে। বম ও পাংখো সম্প্রদায়ের মধ্যে এ নৃত্যের প্রচলন দেখা যায়।এতদঞ্চলের নৃত্য শিল্পীরা দেশে-বিদেশে কৃতিত্ব প্রদর্শন করেছে। উপজাতীয়নৃত্য শিল্পীদের ‘জুম নৃত্য’, ‘গরাইয়া নৃত্য’, ‘বাঁশ নৃত্য’ও ‘বোতল নৃত্য’জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে প্রচুর প্রশংসা কুড়িয়েছে।

নিম্নে ক‘টি ঐতিহ্যবাহী উৎসব, নৃত্য ও পূজার সংক্ষিপ্ত বিবরণ তুলে ধরা হলো মাত্র।

বিজু-সাংগ্রাই-বৈসুকঃ

 

চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা ও তঞ্চঙ্গ্যাদের প্রধান ঐতিহ্যবাহী সামাজিক উৎসব হচ্ছে বিজু-সাংগ্রাই-বৈসুক। এ লোকজ উৎসব চৈত্র মাসের শেষ দুই দিন ও বৈশাখ মাসের প্রথম দিনটি নিয়ে তিনদিনব্যাপী পালিত হয়। চাকমা সমাজে এ তিন দিনকে যথাক্রমে ফুলবিজু, মূল বিজু এবং গজ্জ্যেপজ্জ্যে বলা হয়। মারমা সমাজে দিনগুলোকে যথাক্রমে পাইং ছোয়াই, সাংগ্রাই আফ ও সাংগ্রাই আপ্যাইং এবং ত্রিপুরা সমাজে হারিবৈসুক, বৈসুকমা ও বিসিকাতাল বলা হয়। উৎসবের প্রথম দিন ঘরদোর পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন করা হয়, ছেলে-মেয়েরা ভোরে ফুল তোলে এবং ঘর সাজায় আর কিশোর-কিশোরীরা বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের স্নান করায়। উৎসবের দ্বিতীয় প্রত্যেক ঘরে রুচিসম্মত ও সুস্বাদু খাবাবের আয়োজন করা হয়। ঘরের দরোজা থাকে সকলের জন্য উম্মুক্ত। খাবারের মধ্যে বিভিন্ন সবজি মিশিয়ে রান্না করাপাজন’ হচ্ছে অন্যতম। এ দিনেই মদের যথেচ্ছ ব্যবহার হয়ে থাকে। উৎসবের শেষ দিনে চাকমারা বাড়িতে ভাল খাবার-দাবারের ব্যবস্থা করে। সাম্প্রতিক সময়ে এ দিনে বিহারে বিভিন্ন ধর্মানুষ্ঠানের আয়োজন করা হচ্ছে। অনেকেই আত্মীয় স্বজনের খোঁজ খবরও নিয়ে থাকেন। মারমারা এ দিনে রিলং পোয়েহ্বা Water Festival-এর আয়োজন করে। ত্রিপুরারাদের বিশেষ আয়োজন হচ্ছে গড়াইয়া নৃত্য

রাজ পুন্যাহ্ঃ

 

উপমহাদেশের অন্যান্য অঞ্চল থেকে রাজপ্রথাবিলুপ্ত হলেও পার্বত্য চট্টগ্রামে ঐতিহ্যবাহী রাজাগণ’ এখনো সামাজিক প্রধান হিসেবে শাসন কাজ পরিচালনা করছেন। রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার ১৭৭টি মৌজা নিয়ে চাকমা সার্কেল’ গঠিত।রাজ পুন্যাহ্হলো এমন একটি অনুষ্ঠান যেখানে চাকমা রাজারাজ দরবারে আনুষ্ঠানিকভাবে বসেন এবং হেডম্যানদের নিকট হতে খাজনা আদায় করেন। পূর্বে এ অনুষ্ঠান প্রতি বছর অনুষ্ঠিত হত। এ অনুষ্ঠানে রাজার অধীনস্থ হেডম্যান ও কার্বারীগণ খাজনা পরিশোধের পাশাপাশি রাজাকে বিভিন্ন উপটোকন অর্পন করেন।

কক্সবাজার জেলাঃ

কক্সবাজার জেলার ভূ-প্রকৃতি ও ভৌগলিক অবস্থান এই জেলার মানুষের ভাষা ও সংস্কৃতি গঠনে ভূমিকা রেখেছে। এই জেলার মানুষ সাধারনত চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলে ,তবে কথ্য ভাষায় অনেক ক্ষেত্র কক্সবাজার কেন্দ্রিক শব্দের ব্যবহার লক্ষ করা যায়।যেমন- বাংলাভাষায়পরিচিতকারোসাথেদেখাহলেআমরাজানতেচাই, আপনিকেমনআছেন?  এইকথাটিএখানকারমানুষবলে  এভাবে, ‌''য়নেঁগমআছন্‌নে?'' ঐতিহাসিক ভাবে এ অঞ্চলের মানুষের সাথে বর্তমান মায়ানমার পুর্বে যাকে আরাকান নামে অভিহিত করা হতো তাদের সাথে ব্যাপক গমনাগমনের সর্ম্পক ছিল যা এখন ও সীমিত আকারে হলেও অটুট রয়েছে। এ কারণে আরকানের ভাষার কিছু কিছু উপাদান  কক্সবাজারের কথ্য ভাষায় মিশ্রিত হয়ে গেছে। এই উপজেলায় নৃতাত্বিক রাখাইন জনগোষ্ঠী বসবাস করে।যাদের ভাষার প্রভাব স্থানীয় ভাষায় লক্ষ্য করা যায়।

 

সমুদ্র তীরবর্তী শহর হিসেবে কক্সবাজার জেলার সংস্কৃতি মিশ্র প্রকৃতির। পুর্ব হতেই বার্মার সাথে এ অঞ্চলের মানুষের সম্পর্ক থাকায় এবং রাখাইন নামক নৃতাত্বিক জনগোষ্ঠী বসবাস করায় কক্সবাজারে বাঙালী এবং বার্মিজ সংস্কৃতির এক অভূতপুর্ব সমন্বয় লক্ষ্য করা যায়। বিশেষ করে রাখাইন সংগীত এবং নৃত্যকলা এ অঞ্চলতো বটেই বৃহত্তর চট্টগ্রামের মানুষের কাছে ব্যাপকভাবে সমাদৃত। সমুদ্রতীরবর্তী হওয়ায় এ অঞ্চলের মানুষ প্রাচীনকাল হতেই দুর্যোগিএবং উত্তল সাগরের সাথে সংগ্রাম করে টিকে রয়েছে বিধায় স্থানীয সংস্কৃতিচর্চার মাধ্যম ও উপস্থাপনায় সংগ্রামের সেই চিত্র ফুটে ওঠে, বিশেষ করে জেলে সম্প্রদায়ের প্রাত্যাহিক জীবন।

প্রাচীন ঐতিহ্য:
১৬০০---১৭০০ খৃষ্টাব্দে শাহ সুজার আমলেএকটি মসজিদ তৈরী হয়েছিল। এটি চৌধুরী পাড়া মসজিদ বা আজগবি মসজিদ নামেপরিচিত। এটি কক্সবাজার সদরের বি.ডি.আর ক্যাম্পের উত্তর দিকে অবস্থিত।

প্যাগোড়া (জাদী):
১৭৯০ ইংরেজী সালের দিকে বার্মিজরাআরাকান বিজয়ের পর কক্সবাজারের বিভিন্ন এলাকায় রাখাইন সম্প্রদায় এটি নির্মাণকরে। তারা এটিকে স্মৃতিচিহ্ন বলে। কক্সবাজার সদর, রামু ও টেকনাফের পাহাড়বা উচুঁ টিলায় এ ধরনের প্যাগোড়া দেখা যায়

অগ্গ মেধা বৌদ্ধ ক্যাং:
কক্সবাজার সদরে ছোট বড় মিলিয়ে৭টিরও বেশী বৌদ্ধ ক্যাং রয়েছে। আগ্গা মেধা ক্যাং ও মাহাসিংদোগীক্যাং সবচেয়েবড়। এ সবে স্থাপিত বৌদ্ধ মুর্তিগুলো দেখবার মতো। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদেরধর্মীয় উৎসব বৌদ্ধ পূর্ণিমা, প্রবারণা পূর্ণিমা ও বিষু উৎসব ক্যাং এ উদযাপনহয়।

 

রামকোট তীর্থধাম:
এটি রামকোট বনাশ্রমের পার্শ্বেরপাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত। ৯০১ বাংলা সনে স্থাপিত। কথিত আছে রাম-সীতা বনবাসকালে এই রামকোটে অবস্থান করেছিল। তীর্থধামে মন্দিরের পাশাপাশি আলাদা একটিবৌদ্ধ বিহারে ধ্যানমগ্ন ছোট একটি বৌদ্ধমূর্তিও রয়েছে। জনশ্রুতি আছে, দু’টিধর্ম পাশাপাশি শান্তিতেসহাবস্থানের প্রমাণ স্বরূপ সম্রাট অশোকের সময়েএইমূর্তি স্থাপিত হয়

মাথিনের কূপ:
উপন্যাসিক ধীরাজ ভট্টাচার্য উনবিংশশতাব্দীর প্রথমদিকে এস.আইহিসাবে টেকনাফ থানায় বদলী হয়ে এসেছিলেন। তখনটেকনাফের নাম করা রাখাইন জমিদার ওয়াংথিনের একমাত্র আদুরে কন্য মাথিন থানারসামনের কুয়া থেকে নিয়মিত পানি নিতে আসতো। সকাল বিকাল পানি নিতে আসা ছিলমাথিনের সখ। পুলিশ কর্মকর্তা প্রতিদিন থানার বারান্দায় বসে বসে অপূর্বসুন্দরী মাথিনের পানি নিতে আসা যাওয়া দেখতেন। আস্তেআস্তে ধীরাজভট্টাচার্যের সংগে মাথিনের চোখা চোখি এবং পরে তা’ প্রেমে পরিণত হয়।
বিয়েকরতে ব্যর্থ হলে, মাথিন বিচ্ছেদের জ্বালায় তিলে তিলে দগ্ধ হয়ে মৃত্যু বরণকরে। মাথিনের অতৃপ্ত প্রেমের ইতিহাসের নীরব সাক্ষী মাথিনের কুপ। টেকনাফথানা প্রাঙ্গনে একুপের অবস্থান। বিশিষ্ট সাংবাদিক আবদুল কুদ্দুস রানা ১৯৯৪সালে বাঁশের তৈরী কূপটি সংস্কারের উদ্যোগ নেন। পরবর্তীতে জেলা পরিষদ থেকেএদিকে সংস্কার করা হয়। এখন কূপটি দেখতে খুবই আকর্ষনীয়। সেখানে প্রেমেরসংক্ষিপ্ত ইতিহাসও লেখা রয়েছে। ইদানীং উল্লিখিত কাহিনী অবলম্বনে স্থানীয়শিল্পীদের নিয়ে একটি স্বল্প দৈর্ঘ্য চলচিত্রও নির্মিত হয়েছে।

মা’ অষ্টভূজা:
মহেশখালী আদিনাথশিব মন্দিরের পার্শ্বে ‘অষ্টভূজা’ নামে অপর একটি বিগ্রের মূর্তি রয়েছে।
কক্সবাজারকস্তুরাঘাট হতে নৌযানে ৪৫-৫৫ মিনিট আর স্পীডবোটে ১৫-১৮ মিনিট সময় লাগে।মহেশখালীর গোরকঘাটা জেটি হতে রিক্সা যোগে আদিনাথ মন্দির যাওয়া যায়।

 

খাগড়াছড়ি জেলাঃ

পাহাড়, ছোট ছোট নদী, ছড়া ও সমতল ভূমি মিলে এটি একটি অপরূপ সৌন্দর্য্যমন্ডিত ঢেউ খেলানো এ জেলা। চেঙ্গী, মাইনী ও ফেণী প্রভৃতি এ জেলার উল্লেখযোগ্য নদী। এ ছাড়াও এতে রয়েছে ৩৩৬৮টি পুকুর, জলাশয় ও দীঘি যার ৬৭% খাস।

ইতিহাস পর্যালোচনায় জানা যায়, খ্রিষ্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দী থেকে চতুর্দশ শতাব্দী পর্যন্ত অত্র এলাকাটি কখনো ত্রিপুরা, কখনো বা আরকান রাজন্যবর্গ দ্বারা শাসিত হয়েছে। তন্মধ্যে ৫৯০ হতে ৯৫৩ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত মোট ৩৬৩ বছর ধরে ত্রিপুরা রাজাগণ বংশপরম্পরায় পার্বত্য চট্টগ্রাম (খাগড়াছড়িসহ) ও চট্টগ্রাম শাসন করে। অতঃপর ৯৫৩ খ্রিষ্টাব্দ হতে ১২৪০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত আরকান রাজাগণ ২৯৭ বছরব্যাপী এ এলাকা শাসন করলেও তদ্পরবর্তীতে ১০২ বছরব্যাপী (১৩৪২ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত) পুনরায় ত্রিপুরা রাজাগণ এ এলাকার কর্তৃত্ব করেন।

দর্শনীয় স্থানঃ

আলুটিলা পর্যটন কেন্দ্রঃ

ঐশ্বর্যময় সৌন্দর্য্যের অহঙ্কার খাগড়াছড়ি শহরের প্রবেশ পথেই চোখে পড়বে আলুটিলা পর্যটন কেন্দ্র। আলুটিলা বাংলাদেশের একটি অন্যতম ব্যতিক্রমধর্মী পর্যটন স্পট। আর তাই এর সৌন্দর্য্যে মুগ্ধ হয়ে খাগড়াছড়ির সাবেক জেলা প্রশাসক একটি কবিতা লিখেছিলেন যা অনেকটা এ রকম-‘‘ক্লান্ত পথিক ক্ষণেক বসিও আলুটিলার বটমূলে, নয়ন ভরিয়া দেখিও মোরে চেঙ্গী নদীর কোলে।’’ এ পর্যটন কেন্দ্রে পার্বত্য জেলা পরিষদ ও পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের অর্থায়নে পর্যবেক্ষণ টাওয়ার, বিশ্রাম কক্ষ ও বসার সু-ব্যবস্থাসহ গুহায় যাওয়ার পথে সিঁড়ি করা হয়েছে। এ টিলার চূড়ায় দাঁড়ালে শহরের ছোট-খাট ভবন, বৃক্ষ শোভিত পাহাড়, চেঙ্গী নদীর প্রবাহ ও আকাশের আল্পনা মনকে অপার্থিব মুগ্ধতায় ভরে তোলে। প্রাকৃতিক নৈসর্গের এ স্থানটিকে আরো আকর্ষণীয় করে তোলার লক্ষ্যে সরকার এখানে ইকোপার্ক স্থাপনের কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। পর্যবেক্ষণ টাওয়ার থেকে খাগড়াছড়িকে দেখে দার্জিলিংয়ের সাথে তুলনা করতে পারেন। প্রতিদিন শত শত পর্যটক এখানে বনভোজন করতে কিংবা অবসরে বেড়াতে আসেন। পর্যটকদের নিরাপত্তার জন্য এ স্থানে একটি অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্পও আছে।

 

আলুটিলার ঝর্ণা বা রিছাং ঝর্ণাঃ

জেলা সদর থেকে আলুটিলা পেরিয়ে সামান্য পশ্চিমে মূল রাস্তা থেকে উত্তরে ঝর্ণা স্থানের দূরত্ব সাকুল্যে প্রায় ১১কিঃ মিঃ। ঝর্ণার সমগ্র যাত্রা পথটাই দারুণ রোমাঞ্চকর। যাত্রাপথে দূরের উঁচু-নীচু সবুজ পাহাড়, বুনোঝোঁপ, নামহীন রঙ্গীন বুনোফুলের নয়নাভিরাম অফুরন্ত সৌন্দর্য্য যে কাউকে এক কল্পনার রাজ্যে নিয়ে যায়।ঝর্ণার কাছে গেলে এক পবিত্র স্নিগ্ধতায় দেহমন ভরে উঠে। ২৫-৩০ হাত উঁচু পাহাড় থেকে আছড়ে পড়ছে ঝর্ণার জলরাশি, ঢালু পাহাড় গড়িয়ে নীচে মেমে যাচ্ছে এই প্রবাহ। কাছাকাছি দুটো ঝর্ণা রয়েছে এ স্থানে, প্রতিদিন বহু সংখ্যক পর্যটক এখানে এসে ভীড় জমান এবং ঝর্ণার শীতল পানিতে গা ভিজিয়ে প্রকৃতির সাথে একাত্ম হন। মারমা ভাষায় এর নাম রিছাং ঝর্ণা, ‘রি’ শব্দের অর্থ পানি আর ‘ছাং’ শব্দের অর্থ গড়িয়ে পড়া। মূল সড়ক হতে রিছাং ঝর্ণায় যাওয়ার পথে চারিদিকের পাহাড়ী প্রকৃতি মনের মাঝে এক অনুপম অনুভূতির সৃষ্টি করে। ইচ্ছে করে প্রকৃতির মাঝেই কাটিয়ে দিই সারাক্ষণ। ঝর্ণা ছেড়ে মন চায় না ফিরে আসতে কোলাহল মূখর জনারণ্যে।

 

আলুটিলার সুড়ঙ্গ বা রহস্যময় সুড়ঙ্গঃ

গা ছমছম করা অনুভূতি নিয়ে পাহাড়ী সুড়ঙ্গ পথ বেয়ে অন্ধকার পাতালে নেমে যাওয়া কল্পনার বিষয় হলেও আলুটিলার সুড়ঙ্গ পথ কল্পনার কিছু নয়। আলুটিলা কেন্দ্রের প্রধান আকর্ষণ হচ্ছে এর ‘রহস্যময় সুড়ঙ্গ’। স্থানীয় লোকের ভাষায় ‘‘মাতাই হাকর’’ যার বাংলা অর্থ দেবগুহা। এ পাহাড়ের চূড়া থেকে ২৬৬টি সিঁড়ির নীচে আলুটিলা পাহাড়ের পাদদেশে পাথর আর শিলা মাটির ভাঁজে গড়া এ রহস্যময় সুড়ঙ্গের অবস্থান। গুহামুখের ব্যাস প্রায় ১৮ফুট আর দৈর্ঘ্য প্রায় ২৮০ফুট। প্রবেশমুখ ও শেষের অংশ আলো-আঁধারিতে আচ্ছন্ন। মাঝখানে নিকষ কালো গাঢ় অন্ধকার এ গুহার তলদেশ দিয়ে প্রবাহমান শীতল জলের ঝর্ণাধারা। গা ছমছম করা অনুভূতি নিয়ে এ গুহায় প্রবেশ করাটা একদিকে যেমন ভয়সংকুল তেমনি রোমাঞ্চকরও বটে। শুধু বাংলাদেশেতো বটেই পৃথিরীর অন্য কোন দেশেও এ রকম প্রাকৃতিক সুড়ঙ্গ পথের খুব একটা নজীর নেই। অনন্য সাধারণ এ গুহায় মশাল বা উজ্জ্বল টর্চের আলো ব্যতীত প্রবেশ করা যায় না। মশাল পর্যটন কেন্দ্রেই পাওয়া যায় ১০টাকার বিনিময়ে। গুহার একদিকে ঢুকে অন্যদিকে গিয়ে বেরোতে সময় লাগে মাত্র ১৫/২০মিনিট। উপমহাদেশের একমাত্র প্রাকৃতিক এ সুড়ঙ্গ জেলার প্রধান পর্যটন আকর্ষণ।

 

বান্দরবান জেলাঃ

ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাঙ্গামাটি এবং কক্সবাজার থেকে বান্দরবান বাস যোগাযোগ রয়েছে। বান্দরবান শহর থেকে প্রায় ৪ কিলোমিটার দূরে বালাঘাটায় রয়েছে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বৌদ্ধ মন্দির। এটি সম্পূর্ণরূপে দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়ার মন্দিরগুলোর অনুকরণে তৈরি করা হয়েছে এবং বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বৌদ্ধ মুর্তিটি এখানে রয়েছে। স্থানীয়ভাবে এটি হলো "বুদ্ধ ধাতু জাদি"। এছাড়া শহরের মধ্যেই রয়েছে জাদিপাড়ার রাজবিহার এবং উজানীপাড়ার বিহার। শহর থেকে চিম্বুকের পথে যেতে পড়বে বম ও ম্রো উপজাতীয়দের গ্রাম। প্রান্তিক হ্রদ, জীবননগর এবং কিয়াচলং হ্রদ আরও কয়েকটি উল্লেখ্য পর্যটন স্থান। রয়েছে মেঘলা সাফারী পার্ক, যেখানে রয়েছে দুটি সম্পূর্ণ ঝুলন্ত সেতু। সাঙ্গু নদীতে নৌকাভ্রমণ, ভ্রমণ পিয়াসীদের জন্য হতে পারে একটি মনোহর অভিজ্ঞতা। বান্দরবান শহর থেকে ৮ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত শৈল প্রপাত একটি আকর্ষণীয় পাহাড়ি ঝর্ণা।

 

এছাড়া বাংলাদেশের উচ্চতম পর্বতশৃঙ্গ তাজিংডং এবং বৃহত্তম পর্বতশৃঙ্গ কেওক্রাডং এই বান্দরবান জেলাতেই অবস্থিত। মৌসুমগুলোতে এই দুটি পর্বতশৃঙ্গে আরোহন করার জন্য পর্যটকদের ভীড় জমে উঠে। পর্যটকরা সাধারণত বগা লেক থেকে হেঁটে কেওক্রাডং এ যান। অনেকেই আছেন যারা কেওক্রাডং না গিয়ে বগা লেক থেকে ফিরে আসেন। এই হ্রদটিও বিশেষ দর্শনীয় স্থান। হ্রদসন্নিহিত এলাকায় বম উপজাতিদের বাস।

পার্বত্য চট্টগ্রামে মোট ১১টি নৃতাত্ত্বিক জাতিগোষ্ঠীর বসতি রয়েছে। এরা হচ্ছেন মারমা, চাকমা, মুরং, ত্রিপুরা, লুসাই, খুমি, বোম, খেয়াং, চাক, পাংখো ও তংচংগ্যা । এ ১১টি জাতিগোষ্ঠির বসবাস  রয়েছে  একমাত্র বান্দরবান জেলাতে।  বান্দরবান জেলায় বসবাসকারী উপজাতী জনগোষ্ঠীর মধ্যে সংখ্যা গরিষ্ঠ সম্প্রদায় হলো ‘‘মারমা’’। বান্দরবানের ২য় বৃহত্তর উপজাতি জনগোষ্ঠী মুরং(ম্রো)সম্প্রদায়।এ জেলায় বসবাসরত নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠির রয়েছে আলাদা আলাদা ভাষা ও সংস্কৃতি। এদের অনেক রীতিনীতি, কৃষ্টি, সামাজিক জীবনাচার ও গৌরবময় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে মহামান্বিত ও বৈচিত্র্যময় করেছে। এক সময়ের প্রচলিত রাজ প্রথা ও রাজ পূণ্যাহ্ অনুষ্ঠান মূলত: এ জেলাতেই হয়ে থাকে।